আল মমিন সরকার নাইম
রাবি প্রতিনিধি:
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ক্যাম্পাসে প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থীর কোলাহল,
ক্লাস-পরীক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন অসংখ্য কর্মচারী। পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নিরাপত্তা প্রহরী এবং বিভিন হলের স্টাফদের নিরলস পরিশ্রমেই সচল থাকে এই প্রাণচঞ্চল ক্যাম্পাস। তবে তাদের জীবনসংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা ও প্রত্যাশার গল্প অনেকটাই অজানা রয়ে গেছে।
প্রতিদিন ভোরে যখন অধিকাংশ শিক্ষার্থী ঘুমিয়ে থাকে, তখনই কাজ শুরু করেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক, একাডেমিক ভবন ও আবাসিক হল পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব তাদের কাঁধে। দীর্ঘ সময় কাজ করলেও অনেকেই জানান, তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় কম।
স্টুয়ার্ড শাখার পরিচ্ছন্নতা কর্মী শ্রী অষ্টম কুমার বাহার বলেন, আমরা সকাল নয়টা থেকে কাজ শুরু করি। কোথাও কোনো পশুপাখি মারা গেলে যেমন গতকাল পশ্চিম পাড়ায় একটি কুকুর ড্রেনে মরে পড়ে ছিল এবং তাতে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তখন আমরা সেখানে গিয়ে পরিষ্কার করি এবং মাটি চাপা দিই। এছাড়াও কোনো হল বা শিক্ষকদের বাসায় পানির লাইন বা বাথরুমের ড্রেন বন্ধ হয়ে গেলে আমরা তা ঠিক করি। অনেক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়, কিন্তু আমাদের এই কষ্ট খুব একটা কেউ দেখে না। বেতনটা একটু বাড়লে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারতাম।
নিরাপত্তা প্রহরীরা মোখলেসুর রহমান বলেন, আমরা স্টুয়ার্ড শাখার আন্ডারে কাজ করি। দিন-রাত পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করতে হয় ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের সতর্ক থাকতে হয় সবসময়।রাতের ডিউটি সবচেয়ে কষ্টকর তবুও দায়িত্ববোধ থেকেই কাজ করে যাচ্ছি। শ্রমিক দিবসের প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্যের দাম বেশি আমাদের পে স্কেলটা যদি আরেকটু বাড়ানো যেতে তাহলে আমাদের পরিবারের সাংসারিক খরচ চালানো সহজ হতো।
স্টুয়ার্ড শাখার উপ-রেজিস্টার মো. সোহরাব হোসেন বলেন, আমাদের স্টুয়ার্ড শাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে কাজ করে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো নিরাপত্তা প্রদান। এখানে প্রায় দেড়শতাধিক নিরাপত্তা প্রহরী কর্মরত আছেন, যারা একাডেমিক ভবন, গেট ও বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। তারা অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন।
তিনি আরও বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। স্টুয়ার্ড শাখার কর্মীরা আবাসিক এলাকা, একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনসহ ক্যাম্পাসের রাস্তাঘাট নিয়মিত পরিষ্কার রাখেন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি ক্যাম্পাসকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখতে।
এছাড়াও লেবার সেক্টরের কর্মীরা ক্যাম্পাসের জঙ্গল, ঘাস ও লতাপাতা পরিষ্কার করার কাজ করেন। তারা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে অত্যন্ত কষ্ট করে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক সময় আমরা তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারি না। তাই প্রশাসন ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, যেন তারা তাদের প্রাপ্য সুবিধা পেয়ে পরিবারসহ সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারেন। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলের প্রতি তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, স্থায়ী কর্মচারীরা নির্ধারিত স্কেলে বেতন-ভাতা পেলেও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আর যারা মাস্টার রোল বা দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন, তারা কাজের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক পান এবং আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন।
মহান মে দিবস উপলক্ষে প্রশাসনের কাছে এসব শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করার জন্য তিনি জোর দাবি জানান।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি)
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন বলেন, এই কর্মচারীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চালিকাশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের কল্যাণে প্রশাসন সবসময় সচেষ্ট রয়েছে। ধাপে ধাপে তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর সাপোর্ট স্টাফরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শিক্ষার্থীদের খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজে তারা নিয়োজিত থাকেন। তবে তারাও ন্যায্য মজুরি ও কাজের পরিবেশ উন্নয়নের দাবি জানান।

