ময়মনসিংহ থেকে,এস এ হাসিবঃ
পৌষ মাসের শেষ দিন—ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলায় স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘পুহুরা’। এই দিনটিকে ঘিরেই আড়াই শতাধিক বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী লোকজ খেলা ‘হুমগুটি’।
৪০ কেজি ওজনের পিতলের তৈরি একটি ভারী গুটি নিয়ে শুরু হয় শক্তির লড়াই। ঢাক-ঢোলের তালে তালে নেচে-গেয়ে খেলোয়াড়রা গুটিকে নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে। কোনো রেফারি নেই, নেই নির্দিষ্ট সময়সীমা। বিকেল থেকে গভীর রাত, কখনও টানা দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত চলার নজির রয়েছে এই খেলায়।
খেলাকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে ফুলবাড়িয়ার লক্ষ্মীপুর, বড়ইআটা, ভাটিপাড়া, তেলিগ্রাম, দেওখোলাসহ আশপাশের ১৪ থেকে ১৫টি গ্রামে। মেয়েরা আসে বাপের বাড়িতে, বাড়ি বাড়ি চলে পিঠাপুলির উৎসব। খেলাস্থলে বসে গ্রামীণ ‘পুহুরা’ মেলা। জবাই হয় গরু-ছাগল। পুরো এলাকা রূপ নেয় মিলনমেলায়।
খেলার মূল কেন্দ্র ফুলবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে লক্ষ্মীপুর এলাকার বড়ইআটা বন্দ—একটি পতিত জমি। সকাল থেকেই ফুলবাড়িয়া ছাড়াও ত্রিশাল ও মুক্তাগাছা উপজেলা থেকে হাজারো মানুষ এখানে জড়ো হন। কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হয়—
“জিতই আবা দিয়া গুটি ধররে… হেইও!”
এই হুমগুটি খেলার ইতিহাসের শিকড় প্রোথিত ব্রিটিশ আমলে। প্রায় আড়াইশ বছর আগে মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্ত ও ত্রিশালের বৈলরের জমিদার হেমচন্দ্র রায়ের মধ্যে জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিরোধ মীমাংসার জন্য তালুক ও পরগনার সীমানায় আয়োজন করা হয় এই গুটি খেলা। শর্ত ছিল—যে পক্ষ গুটি দখলে নিতে পারবে, তাদের এলাকা হবে ‘তালুক’, আর পরাজিত অংশ হবে ‘পরগনা’। সেই খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হয়। তখন থেকেই তালুক-পরগনার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে শুরু হয় হুমগুটি খেলা।
এই খেলায় একেক এলাকার জন্য থাকে একেকটি নিশানা। সেই নিশানা দেখেই বোঝা যায় গুটি কোন দিকে যাচ্ছে। শক্তি, কৌশল আর দলীয় সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হয় বিজয়।
২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি, বাংলা পৌষ মাসের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হয় হুমগুটি খেলার ২৬৭তম আসর। এবছর এই ঐতিহ্যবাহী খেলায় বিজয়ী হয়েছে ফুলবাড়িয়া উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের জোড়বাড়িয়া এলাকার খেলোয়াড়রা।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই হুমগুটি আজ শুধু একটি খেলা নয়—এটি ফুলবাড়িয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

