কেরানীগঞ্জ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া পরিচালনা এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ না করেই অর্থ ছাড়ের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ উঠেছে এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগে ঢাকা জেলা এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী শরিফুজ্জামান বুলবুল, কেরানীগঞ্জ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক তাজুল ইসলাম তুহিন এবং সংশ্লিষ্ট কনসালটেন্টের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, এলজিইডির অধীনে বর্তমানে কেরানীগঞ্জ উপজেলার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। এগুলো হলো—
১. তেঘরিয়া–মোল্লারহাট সড়ক
২. ইকুরিয়া–জিন্দা পীরের মাজার সড়ক
৩. বনগ্রাম বাজার থেকে জিন্দা পীরের মাজার রোডের আরাকুল পয়েন্ট হয়ে মজিদ বেয়ারার মৌজায় সংযুক্ত সড়ক
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় একাধিক অনিয়ম হয়েছে। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে গত ১৫ এপ্রিল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ (উন্নয়ন-২) থেকে বিষয়টি তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধান প্রকৌশলীর কাছে নির্দেশনামূলক চিঠি পাঠানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা না করে দ্রুত অর্থ ছাড়ের উদ্যোগ নেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা জেলা এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী শরিফুজ্জামান বুলবুল জানান, তার পক্ষে বিষয়টি সংশোধন করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে কেরানীগঞ্জ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক তাজুল ইসলাম তুহিন গণমাধ্যমকে বলেন, “আপনারা ইঞ্জিনিয়ার নন, এসব বিষয় বুঝবেন না।”
বনগ্রাম বাজার থেকে জিন্দা পীরের মাজার সড়কের আরাকুল পয়েন্ট এলাকায় প্রায় ৭২৫ মিটার গ্রামীণ সড়ক ৭০ ফুট প্রশস্ত করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ছিল, ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক সম্প্রসারণে দুই পাশ থেকে সমন্বিতভাবে জমি অধিগ্রহণের নিয়ম থাকলেও কিছু এলাকায় একপাশ থেকে জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বৈষম্যমূলক এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য অন্যায্য।
এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, প্রথম পর্যায়ে তার জমির ১০ শতাংশ এবং পরে আরও ১৬ শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণের আওতায় আনা হয়েছে। অথচ পুরো সড়কের মধ্যে তার বাড়ির অংশকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
আরেক ভুক্তভোগী, যিনি সনাতন ধর্মাবলম্বী, বলেন— এটি একটি গ্রামীণ সংযোগ সড়ক হওয়ায় ৩০ থেকে ৪০ ফুট প্রশস্ত করলেই যথেষ্ট। কিন্তু ৭০ ফুট প্রশস্ত করার প্রস্তাবের কারণে তাদের দুটি মন্দির, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে সড়কের নকশা প্রণয়নের সময় যথাযথ জনমত নেওয়া হয়নি এবং এখনো সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব বহন করতে হচ্ছে।
জেলা প্রশাসকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির জন্য ভূমি অধিগ্রহণে প্রায় ৪৭৩ কোটি টাকার বেশি প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর দাবি, সংশ্লিষ্ট সড়কটি গ্রামের সংযোগ সড়ক হওয়ায় ৪০ থেকে ৫০ ফুট প্রশস্ত করলেই প্রয়োজন মিটবে এবং এতে সরকারের প্রায় ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে।
তাদের যুক্তি, প্রস্তাবিত সড়কের খুব কাছেই ঢাকা–মাওয়া মহাসড়ক বিদ্যমান থাকায় একই এলাকায় আরও একটি বড় আকারের সংযোগ সড়কের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অভিযোগকারীরা জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা একাধিকবার প্রধান প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এ অবস্থায় ভুক্তভোগীরা প্রকল্পটির ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন, ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে প্রধানমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিক তদন্ত ও প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হলে একদিকে যেমন জনগণের ক্ষয়ক্ষতি কমবে, অন্যদিকে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থও সাশ্রয় হবে।

