মোঃ শাহজালাল – বরগুনা
বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের সম্ভাবনাময় জেলা বরগুনা। সমুদ্র, নদ-নদী, মৎস্যসম্পদ, কৃষি ও পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও শিল্পায়নের অভাব, সীমিত কর্মসংস্থান, দুর্বল অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে জেলার উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না। এর ফলে বাড়ছে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অভিবাসন; পাশাপাশি অবহেলিত হয়ে পড়ছে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্য।
জেলায় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান না থাকায় অধিকাংশ মানুষ কৃষি, মাছ ধরা, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার কারণে এসব খাতও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বছরের দীর্ঘ সময় অনেক মানুষ কর্মহীন থাকেন। কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতিবছর অসংখ্য তরুণ ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, যা পরিবার ও সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্যও ক্রমেই বাড়ছে। চরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার বহু পরিবার এখনো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ বাসস্থানের মতো মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের জীবন-জীবিকাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
অন্যদিকে বরগুনার ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতিও হারিয়ে যাওয়ার পথে। একসময় গ্রামাঞ্চলে পালাগান, জারিগান, সারিগান, কবিগান ও লাঠিখেলার ব্যাপক প্রচলন থাকলেও এখন সেগুলো নেই বললেই চলে। পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে নতুন প্রজন্ম এসব ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। প্রতিভাবান লেখক ও কবিরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করলেও নিয়মিত সাহিত্যসভা, প্রকাশনা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ অপ্রতুল। একইভাবে সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর অভাবে সংগীত, নাটক, নৃত্য ও আবৃত্তিচর্চাও কাঙ্ক্ষিতভাবে বিকশিত হচ্ছে না।
জেলা পর্যটন শিল্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সোহেল হাফিজ বলেন, ‘বরগুনার সবচেয়ে বড় শক্তি এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের সম্ভাবনা। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জেলার অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।’
বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর মো. সালেহ বলেন, ‘শিল্পায়নের অভাব, কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বরগুনার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।’
বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মনির হোসেন কামাল বলেন, ‘অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের জীবনমান, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সংস্কৃতির বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলীয় মানুষের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান, নিরাপদ জীবনযাপন এবং সাংস্কৃতিক বিকাশে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, বরগুনার টেকসই উন্নয়নের জন্য শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, পর্যটন খাতের বিকাশ এবং জলবায়ু সহনশীল পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ, সাহিত্যচর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে বরগুনা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক-উভয় ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম হবে।

