মো. দিলুয়ার হোসেন – শাল্লা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে ভূমধ্যসাগরে অসংখ্য তরুণের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া এক আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে শাল্লা থানা পুলিশ। গ্রেফতারকৃত আসামির নাম তাফাজ্জুল মিয়া (৫০)। সে শাল্লা উপজেলার শাল্লা গ্রামের মৃত মো. মদন মিয়ার ছেলে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শাল্লা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রোকিবুজ্জামান এর নেতৃত্বে এসআই (নিঃ) মো. শাহজাহান ও এসআই (নি:) ইমাম আরফিনসহ পুলিশের একটি চৌকস দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।
রাতে আসামির নিজ বসত বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এই চক্রের অন্য দুই পলাতক আসামি—মো. আকাশ মিয়া (২৭) ও তার পিতা গুলজার মিয়া (৫২)-কে গ্রেফতারে পুলিশের চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, শাল্লা গ্রামের মাসুদ রানা রাকিব নামের এক যুবককে সুদূর ইতালি পাঠানোর স্বপ্ন দেখায় এই চক্রটি। চক্রের অন্যতম মূলহোতা ও আন্তর্জাতিক দালাল চক্রের সদস্য মো. আকাশ মিয়া তার সহযোগীদের মাধ্যমে রাকিবের পরিবারের কাছ থেকে নগদ ২২,০০,০০০/- (বাইশ লক্ষ) টাকা হাতিয়ে নেয়। কিন্তু ইতালির পরিবর্তে রাকিবকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় লিবিয়ার এক ভয়ঙ্কর মাফিয়া চক্রের হাতে।
সেখানে রাকিবের ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। লিবিয়ান মাফিয়ারা রাকিবকে নির্মমভাবে মারধর করে সেই নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে বাংলাদেশে তার পরিবারের কাছে পাঠায়। ছেলের জীবন বাঁচাতে পরিবারটি আসামিদের মাধ্যমে আরও ১০,০০,০০০/- (দশ লক্ষ) টাকা দিতে বাধ্য হয়। সব মিলিয়ে চক্রটি ৩২ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়।
টাকা দিয়েও মুক্তি মেলেনি রাকিবের। লিবিয়ায় দীর্ঘদিন মানবেতর জীবনযাপন করার পর, স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহযোগিতায় তিনি আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM) এবং লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে, দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শেষে বিগত ০১/১২/২০২৫ইং তারিখে তিনি বিমানযোগে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
দেশে ফিরে ভুক্তভোগী মাসুদ রানা রাকিব বাদী হয়ে শাল্লা থানায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন (শাল্লা থানা এফআইআর নং-১১, জি আর নং-৭৭, ধারা- ৭/৬/৮ মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২)।
শাল্লা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রোকিবুজ্জামান জানান,
”গ্রেফতারকৃত তাফাজ্জুল মিয়া একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য। এই চক্রের মূলহোতা আকাশ মিয়া সাগরে ট্রলার ডুবিয়ে ও মাফিয়াদের হাতে তুলে দিয়ে অসংখ্য মানুষের জীবন বিপন্ন করেছে। গ্রেফতারকৃত আসামিকে গতকাল শনিবার বিধি মোতাবেক সুনামগঞ্জের আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে এবং পলাতক বাকি আসামিদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধীদের কোনো ভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
এই গ্রেফতারের খবরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।

