আতিকুর রহমান, উপজেলা প্রতিনিধি
আলীকদম, বান্দরবান।
দুর্গম পাহাড়ি জনপদ কুরুকপাতায় ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, শান্তি ও সম্প্রীতি সুদৃঢ় করার প্রত্যয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ম্রো সম্মেলন-২০২৬। বিপুল সংখ্যক ম্রো নারী-পুরুষ ও তরুণ-তরুণীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দিনব্যাপী এ সম্মেলন পরিণত হয় মতবিনিময় ও সম্প্রীতির এক মিলনমেলায়।
রোববার আলীকদম উপজেলার কুরুকপাতা ইউনিয়নে আয়োজিত সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, এসপিপি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, কমান্ডার ৬৯ পদাতিক ব্রিগেড ও রিজিয়ন কমান্ডার, বান্দরবান রিজিয়ন।
সম্মেলনে আলীকদম জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ আশিকুর রহমান আশিক, এসপিপি, পিএসসি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কারবারী, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, নারী ও যুব প্রতিনিধি ছাড়াও বিভিন্ন পাড়া থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন ম্রো জনগোষ্ঠীর সদস্য অংশ নেন।
শান্তির স্মৃতি থেকে উন্নয়নের অঙ্গীকার
সম্মেলনে রিজিয়ন কমান্ডার কুরুকপাতায় শান্তি প্রতিষ্ঠার অতীত উদ্যোগের কথা স্মরণ করে বলেন, ২০১৫ সালে ম্রো ন্যাশনাল পার্টির ৭৯ জন সদস্য অস্ত্র সমর্পণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। ম্রো সোশ্যাল কাউন্সিলের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতা এবং সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সহযোগিতায় সম্পন্ন হওয়া ওই ঘটনাকে তিনি শান্তির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন—তিনটি একই সুতোয় গাঁথা।” শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের সুফল প্রত্যন্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
আলীকদমে বসবাসরত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের ঐতিহ্য ধরে রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষায় বদল আনতে উদ্যোগ
সম্মেলনে প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। রিজিয়ন কমান্ডার জানান, আলীকদমে ম্রো কমপ্লেক্সের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের আবাসিকভাবে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে আলীকদম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ম্রো, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ভাঙ্গা সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ক্রাঞ্চিপাড়া সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর কথাও তুলে ধরা হয়।
নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করেই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও দক্ষ প্রজন্ম গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
যুব ও নারী—উন্নয়নের চালিকাশক্তি
ম্রো যুবকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে ড্রাইভিং ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণের উদ্যোগের কথা জানানো হয়। ভবিষ্যতে মোবাইল সার্ভিসিংসহ আরও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়।
অন্যদিকে নারীদের স্বাবলম্বী করতে নার্সিং, প্রাথমিক চিকিৎসা ও ধাত্রী/মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানানো হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়।
স্বাস্থ্য ও বিশুদ্ধ পানিতে নজর
দুর্গম পাড়াগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে মেডিকেল ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানানো হয়। পাশাপাশি হাম, রুবেলাসহ বিভিন্ন টিকাদান কার্যক্রমেও সহযোগিতা করা হয়েছে।
পানি সংগ্রহের কষ্ট কমাতে প্রাথমিকভাবে পাঁচটি পাড়ায় পানি পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য প্রয়োজনীয় এলাকাতেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সড়ক, নৌযান ও মোবাইল নেটওয়ার্কে নতুন উদ্যোগ
কুরুকপাতার দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে নৌযান ও চাঁদের গাড়ির স্বল্পমূল্যের পরিবহন ব্যবস্থা চালুর কথা জানানো হয়।
এছাড়া মেন্দনপাড়া–বলাইপাড়া হয়ে প্রায় ১৭ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। ডিজিটাল যোগাযোগ বাড়াতে কুরুকপাতা ইউনিয়নে পাঁচটি মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সম্মেলনে জানানো হয়।
অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে সতর্কবার্তা
মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালানের ঝুঁকি রয়েছে উল্লেখ করে স্থানীয় জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।
অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম, কাঠ ও বালু উত্তোলন, গরু চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্র পাচার, চাঁদাবাজিসহ যেকোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। সন্দেহজনক কোনো কর্মকাণ্ড চোখে পড়লে নিকটস্থ সেনা বা বিজিবি ক্যাম্পে জানানোর অনুরোধ করা হয়।
সমস্যার কথা সরাসরি জানালেন ম্রো প্রতিনিধিরা
সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল বিভিন্ন পাড়া থেকে আসা ম্রো প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়। তাঁরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি, কর্মসংস্থান, নিরাপদ পানি, মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণসহ নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
রিজিয়ন কমান্ডার প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনেন এবং বাস্তবসম্মত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বয়ে পর্যায়ক্রমে সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কোনো একক পক্ষের দায়িত্ব নয়; এর জন্য জনগণ, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
আস্থার সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যয়
সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ম্রো জনগোষ্ঠী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মনে করছেন আয়োজকরা।
রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে সক্ষম করে তোলাই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। শান্তির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের মাধ্যমে কুরুকপাতাসহ পুরো আলীকদমকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
বিপুল অংশগ্রহণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত ম্রো সম্মেলন-২০২৬ শেষ হয় শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের নতুন অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে।

