মোঃরেজাউলহক রহমত, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে পুলিশ হেফাজতে পাঁচদিন ধরে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আব্দুল্লাহ (২৩) নামে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই স্থানীয়রা ছলিমগঞ্জ পুলিশ ক্যাম্প ঘেরাও করে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন।
নিহত আব্দুল্লাহ বাঞ্ছারামপুর উপজেলার তেজখালী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের বাসিন্দা।
জানা গেছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকালে সলিমগঞ্জ বাজার এলাকা থেকে চুরির সন্দেহে আব্দুল্লাহকে আটক করে স্থানীয় কয়েকজন। এরপর গণপিটুনি দিয়ে তাকে সলিমগঞ্জ অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্পে হস্তান্তর করা হয়।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, আটক করার পর পুলিশ তাকে হাসপাতালে না নিয়ে ক্যাম্পেই গোপনে পাঁচদিন আটকে রাখে। এই সময় তাকে পিটিয়ে এবং মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রবিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টার দিকে ক্যাম্পে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন আব্দুল্লাহ। তখন তিনি অসহায়ভাবে “পানি দাও পানি দাও” বলতে বলতে ক্যাম্পেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
তাকে দ্রুত সলিমগঞ্জ অলিউর রহমান জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে রেফার করেন। কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়।
নিহতের ছোট ভাই সাকিল মিয়া এ ঘটনায় নবীনগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় সলিমগঞ্জ পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ এসআই মো. মহিউদ্দিন, স্থানীয় তবির মিয়া, আলামিনসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়, “আসামিরা পরিকল্পিতভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে আব্দুল্লাহকে হত্যা করেন।”
পুলিশ সূত্র জানায়, ক্যাম্পে আব্দুল্লাহকে আটকের বিষয়টি নবীনগর থানার ওসি বা অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে না জানিয়ে গোপন রাখা হয়। একই অভিযানের অংশ হিসেবে আরও দুইজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হলেও, আব্দুল্লাহকে গোপন রেখে দিনের পর দিন নির্যাতন চালানো হয়।
আব্দুল্লাহর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার সকাল থেকেই বিক্ষুব্ধ জনতা সলিমগঞ্জ পুলিশ ক্যাম্প ঘেরাও করে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন শুরু করে। উত্তেজনা বাড়তে থাকায় প্রশাসন ক্যাম্পের সকল কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ সুপার এহতেশামুল হক নিজেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি সলিমগঞ্জ ক্যাম্প ইনচার্জ এসআই মো. মহিউদ্দিনকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে দুপুরে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
নবীনগরের এই ঘটনা আবারও পুলিশের হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন সামনে এনেছে।
এলাকাবাসী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
একইসঙ্গে, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা অবস্থায় উচ্চমহলের নীরবতা এবং দায়সারা মনোভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।

