গত বছরের আলোচিত ‘জুলাই পরিবর্তনের’ পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের মনে জেগেছিল স্বপ্ন—একটি নিপীড়নমুক্ত, গণতান্ত্রিক এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের ক্যাম্পাসের। পরিবর্তনের অঙ্গীকারে দায়িত্ব নেওয়া নতুন প্রশাসনের পদক্ষেপ শুরুতে আশাব্যঞ্জক মনে হলেও, এক বছর পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ভিন্নচিত্র ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া।বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ১০ হাজার আসনবিশিষ্ট ১৭টি আবাসিক হলের বাস্তবতায় আবাসন সংকট দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রধান সমস্যা। জুলাই পরিবর্তনের পরও নির্মাণাধীন দুটি হল ছাড়া কোনো নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। বরং সম্প্রতি মতিহার হলে গণরুম খালি করতে দেওয়া নোটিশ বিতর্ক তৈরি করে এবং প্রশাসন বাধ্য হয় নমনীয় হতে।গণরুমে থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তিসা খাতুন বলেন, “তৃতীয় বর্ষেও এখনও নিজস্ব রুম পাইনি। গাদাগাদি করে থাকা ও ব্যক্তিগত পরিসরের অভাব জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।”এছাড়া সিট বরাদ্দে দলীয় সুপারিশ ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও রয়েছে। শহীদ জিয়াউর রহমান হলের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, “দুই দফায় একশোর বেশি আসন বরাদ্দ দেওয়া হলেও, রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক অনৈতিক সিট বরাদ্দ হয়েছে।”সিট বরাদ্দে ‘মেধা’ নির্ভর নীতিতেও রয়েছে মতবিরোধ। শামসুজ্জোহা হলের শিক্ষার্থী শাকিল বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মানেই তো একবার মেধার প্রমাণ দেওয়া। আবার নতুন করে প্রমাণ চাওয়াটা অসম্মানজনক।” তিনি জানান, দরিদ্র শিক্ষার্থীরা টিউশনের কারণে সময় দিতে না পারায় ফলাফল খারাপ হয় এবং তারা সিট থেকে বঞ্চিত হন।প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য দাবি করা হয়, এখন মেধাভিত্তিক স্কোরিং পদ্ধতিতে স্বচ্ছভাবে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। হল প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক জামিরুল ইসলাম বলেন, “তালিকা প্রস্তুত করে নির্দিষ্ট মানদণ্ডে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।”তবে শিক্ষক মেস ব্যবসা সংক্রান্ত অভিযোগও উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অধ্যাপক জানান, “অনেক শিক্ষকের আশপাশে মেস আছে। শতভাগ আবাসিকতা হলে এ ব্যবসা মার খাবে, তাই সকলে চায় না।”অন্যদিকে, হলের খাবারসংক্রান্ত অসন্তোষও ব্যাপক। কেটারিং চালু হলেও খাবারের মানে সন্তুষ্ট নন শিক্ষার্থীরা। হবিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থী শহিদুল বলেন, “খাবারের তালিকায় কিছু নতুন ভর্তা যোগ হয়েছে, কিন্তু মান আগের মতোই। অনেক সময় বাইরে খেতে হয়, যা ব্যয়সাপেক্ষ।”বগম রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী আসিয়া ব্যঙ্গ করে বলেন, “প্রশাসন তো শুধু ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে। কিন্তু বাস্তবে খাবারের মান একই রয়ে গেছে।”প্রাধ্যক্ষ জামিরুল অবশ্য বলেন, “খাবারে ভর্তুকি নেই, তবে অবকাঠামো ও বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকি আছে। পেশিশক্তির কারণে কেউ আর বাকি খেতে পারে না, ফলে পরিবেশ আগের চেয়ে ভালো।”‘জুলাই পরিবর্তনের’ মূল দাবিগুলোর একটি ছিল গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। এরই ধারাবাহিকতায় ৩৫ বছর পর রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ভোটের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও ছাত্রদলের অভিযোগ, আলোচনা ছাড়াই তফসিল দেওয়া হয়েছে। সভাপতি সুলতান রাহী বলেন, “ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচন কোনোভাবে হতে দেওয়া হবে না।”সাম্প্রতিক সময়েও ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহাবস্থানের সংকট প্রকট। ২৭ মে বামপন্থী জোটের মিছিলে হামলার অভিযোগ ওঠে ‘শাহবাগবিরোধী জোট’-এর বিরুদ্ধে। যদিও দুই পক্ষই প্রক্টরের কাছে অভিযোগ দিয়েছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, “একটি সংগঠনের আধিপত্য আগেও ছিল, এখনও আছে। প্রশাসন আশ্বাস দিলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।”ছাত্র অধিকার পরিষদের মেহেদী মারুফ মনে করেন, “গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা হতাশাজনক।”অন্যদিকে, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে হামলা ও নির্বাচন নিয়ে। শিবির সভাপতি জাহিদ বলেন, “বামপন্থীরাই হামলা চালিয়েছে। প্রশাসনের উচিত নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নেওয়া।”সাম্প্রতিক সহিংসতায় অ্যালামনাই নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায় এবং কমিশনার পদত্যাগ করেন। তবে প্রশাসন এসব নিয়ে কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে একজন কর্মকর্তাকে নির্যাতনের ঘটনার পরও মামলা হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভুক্তভোগীরা মামলা করতে রাজি না হওয়ায় তারা আইনগতভাবে অগ্রসর হতে পারছে না। তবে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনসহ নিরাপত্তা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।উপ-উপাচার্য ফরিদ খান বলেন, “বহিরাগতদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়া যাবে না। পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছি যাতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

