আন্তর্জাতিক:
সম্প্রিত অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস হেকমান চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)-কে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাত্কারে তিনি এআই প্রযুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘সমতুল্য শুল্কনীতি’ এবং চীনের উন্নয়ন নিয়ে নিজের ধারণা তুলে ধরেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী ধরনের ক্ষমতায়ন ও রূপান্তর এনেছে? এ প্রশ্নের উত্তরে হেকমান বলেন, প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জিনিসের উদ্ভব হচ্ছে, নতুন নতুন দক্ষতার বিকাশ ঘটছে এবং নতুন নতুন সুযোগের সৃষ্টি হচ্ছে। যখন মানুষ চাকরির ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করে, তখন এর দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার অর্থ কেবল বেকারত্বই বোঝায় না; এর অর্থ চাকরির উন্নতিও হতে পারে। যদি কারখানায় কাজ করার সময় এআই আমাকে পণ্য উত্পাদন করতে বা কাজগুলো আরও ভালোভাবে সম্পন্ন করতে সাহায্য করতে পারে, তবে এটি প্রকৃতপক্ষে আমার চাকরির নিরাপত্তা বাড়িয়ে তুলতে পারে। জেনারেটিভ এআই মূলত নতুন ধারণা তৈরি করা অথবা মানুষের চিন্তাভাবনাকে আরও স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট করে তোলার সাথে সম্পর্কিত।
১৯৯৭ সালে অধ্যাপক জেমস হেকমান প্রথমবারের মতো চীন সফর করেন। তারপর, তিনি কয়েক বার চীন সফর করেছেন। চীনের উন্নয়ন তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। তিনি বলেন, চীনের উন্নয়ন অবিশ্বাস্যভাবে দ্রুত হয়েছে। যদি আমরা চীনকে সামগ্রিকভাবে দেখি—শুধু আমার গবেষণার ক্ষেত্রের মধ্যে নয়, বরং এর সার্বিক উন্নয়ন বিবেচনা করে—তা পেশাগত কাঠামোর পরিবর্তন হোক বা শিল্পোন্নয়ন, চীন তার পণ্য উত্পাদনের গুণগত মানে এক উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। পাশাপাশি, লজিস্টিক ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে উন্নত হয়েছে। আমরা দেখতে পাই যে, চীনের অবকাঠামো—মহাসড়ক, রেলপথ, বিমানবন্দর এবং দেশটির আন্তঃসংযোগ ও লজিস্টিক ব্যবস্থা আরও সুসম্পন্ন ও প্রাণশক্তিতে ভরপুর হয়ে উঠেছে, যা ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে এসেছে। প্রায় দশ বছর আগে, ‘দা নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকার একজন সাংবাদিক তত্কালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার চীন সফরের উদ্ধৃতি দিয়ে একটি বই লিখেছিলেন। ওবামা সেই সময়ে চীনে নির্মিত সেতু, মহাসড়ক এবং অন্যান্য অবকাঠামোর প্রশংসা করেছিলেন। ওবামা উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তখন ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধবিগ্রহে অর্থ ব্যয় করে জর্জরিত ছিল, কিন্তু চীন তা করেনি, যা দেশটিকে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, রাস্তা নির্মাণ এবং শিল্প বিকাশের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। তা ছাড়া, চীন বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাসহ অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাই, চীন প্রায় প্রতিটি অর্থনৈতিক খাতেই উন্নতি করেছে। এটা আমার কাছে অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
অধ্যাপক হেকমান অন্যান্য দেশের ওপর মার্কিন সরকারের আরোপিত তথাকথিত ‘সমতুল্য শুল্ক’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি এবং আরও কয়েক ডজন প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদ যৌথভাবে একটি শুল্ক-বিরোধী বিবৃতিতে স্বাক্ষর করে প্রকাশ্যে ও জোরালোভাবে শুল্ক এবং বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদের বিরোধিতা করেছেন। এটি প্রথমবার ছিল না; তাঁরা এর আগে ২০১৯ সালেও মার্কিন সরকারকে একই ধরনের একটি যৌথ চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তিনি বলেন, আরোপিত শুল্কগুলো যেকোনো মৌলিক অর্থনৈতিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। যদি বিভিন্ন দেশের জন্য নির্ধারিত নির্দিষ্ট করের হারগুলো ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করেন, তাহলে দেখবেন যে, সেগুলোর কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি বা অন্তর্নিহিত যুক্তি নেই। বর্তমান পরিস্থিতি হলো যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। তারা বিশ্বাস করে যে, শুল্ক আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণভাবে এই পণ্যগুলো উত্পাদন করতে পারবে, যার ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে। প্রথমত, এটি কেবল কার্যকারিতা হ্রাস করে, কারণ আমরা এমন অনেক ফসল ফলাতে পারদর্শী নই যা অভ্যন্তরীণভাবে উত্পাদন করা যায় না, যেমন অ্যাভোকাডো এবং কফি।
দ্বিতীয়ত, এটি দরিদ্র, শ্রমিক এবং অন্যান্য গোষ্ঠী, যারা এই পণ্যগুলো কেনে, তাদের প্রকৃত ক্ষতি করে। কফি একটি জনপ্রিয় ভোগ্যপণ্য, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র কফি বীজ চাষ করে না। আমি বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে দেখেছি যে, কফির দাম ১৫ শতাংশ, ২০ শতাংশ বা এমনকি ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বাণিজ্যের ওপর অস্থিতিশীলতার ছায়া ফেলেছে। শুল্ক মাঝে মাঝে আরোপ ও মওকুফ করা হচ্ছে এবং দেশগুলো শুল্ক নিয়ে ঘন ঘন আলোচনা করছে। মৌলিক অর্থনৈতিক নীতি থেকে আমরা জানি যে, যখন এই ধরনের অনিশ্চিত সংকেত দেখা দেয়, তখন মানুষ অপেক্ষা করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পছন্দ করে; বিনিয়োগে অনিচ্ছুক থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকে। আমরা এই দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কগুলোকে ধ্বংস করে দিচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্র একটি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হচ্ছে।
বর্তমানে, দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য করার সময় শুল্ক এড়ানোর চেষ্টা করে তাদের বাণিজ্যের মডেল পরিবর্তন করছে। মার্কিন নীতির এই খামখেয়ালি প্রকৃতির কারণে, অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্যবসা ত্যাগ করে বিকল্প সরবরাহকারী খুঁজছে।
অধ্যাপক হেকমান একবার তাঁর বইতে বলেছিলেন, তিনি চীনের উন্নয়ন সম্পর্কে সবসময় একটি ইতিবাচক ও আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, চীনা জনগণের একটি গভীর মূল্যবোধ ব্যবস্থা, অধ্যবসায় এবং সত্যিকারের মূল্যবান সদ্গুণ ও ব্যক্তিগত গুণাবলী রয়েছে। তিনি বলেন, আমার দেখা বেশিরভাগ চীনা ছাত্রছাত্রী ও মানুষের মধ্যে, এমনকি কিছু ছোটখাটো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও, একতা ও জাতীয় গর্বের এক দৃঢ় অনুভূতি বিদ্যমান। ঠিক এই জিনিসটারই অনেক আমেরিকানদের মধ্যে অভাব রয়েছে।
সূত্র:শিশির-আলিম-আকাশ,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।

