তৌহিদুল ইসলাম শামিম, হিলি (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার হিলি ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল পেট্রোল নিতে এসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে দুইজন বাইকার।
আজ শনিবার ১৮ এপ্রিল দীর্ঘ চার দিন পরে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে হিলি ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল পেট্রোল দেওয়া শুরু করে। কাঙ্ক্ষিত এই পেট্রোল পেতে আগের দিন বিকেল থেকে বাইকাররা লাইনে দাঁড়াতে শুরু করে। হঠাৎ রাতে বৃষ্টি হওয়ায় বাইকাররা বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাত্রিযাপন করে। এর মধ্যে শত শত বাইকের সিরিয়াল হয়ে যায়। বাইকারদের দাবি, একদিন পর জ্বালানি তেল দিলে হয়তো এত ভোগান্তি হতো না। তবে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে পেট্রোল দেওয়া নিয়ে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার অশোক বিক্রম চাকমা নিজে উপস্থিত থেকে, তদারকি অফিসার উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার সাখাওয়াত হোসেন ও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে গাড়ি সিরিয়াল করে, প্রথমে পল্লী বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যকর্মী, উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের লোকজন, গণমাধ্যমকর্মীদের গাড়িতে প্রতি ৩০০ টাকার তেল দেয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইকের লাইন দীর্ঘ হতে থাকে।
তেল নিতে আসা একজন বাইকার বলেন, গাড়িতে তেল নেই, মাঝরাস্তায় তেল শেষ হয়েছে, তাই গাড়ি খুব কষ্ট করে ঠেলে বিকেলে নিয়ে এসেছি। সকালে তেল পাওয়ার আশায়। হঠাৎ রাতে বৃষ্টি হওয়ায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাত্রিযাপন করেছি। সকালে তেল দেওয়া শুরু করলে কিছু ব্যক্তিকে আগে তেল দেওয়া শুরু করে। তার পর প্রায় সাড়ে আটটার দিকে আমাদের শুরু করে। পাঁচ দিন পরে এত কষ্ট করে মাত্র ৩০০ টাকার তেল পেট্রোল পেলাম, আগে জানতে পারলে আসতাম না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, যে দীর্ঘ লাইনে পড়েছি তেল পাব কি না জানি না। যদি আজকে তেল না পাই, তাহলে আগামীকাল প্রতিষ্ঠানে ভ্যানে চড়ে যেতে হবে। আর শুনছি ৩০০ টাকার তেল দেবে, কয় দিন চলবে।
আরেকজন বাইকার বলেন, আমি দুপুর প্রায় বারোটার দিকে এসে তীব্র রোদ উপেক্ষা করে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছি। কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ করে ইউএনও এসে বলে, আপনার গাড়ির কাগজ নেই, চলে যান। আমি একটু দেরি করায় ওনার সঙ্গে থাকা আনসার ও পুলিশ কয়েকজনের গাড়ির চাবি নিয়ে যায়। অথচ তার সামনে নাম্বারবিহীন গাড়িতে তেল দেওয়া দেখা গেছে। আবার যারা নেতা তারা সিরিয়াল না মেনে সামনের দিক থেকে তেল নিচ্ছে ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে। এই দীর্ঘ লাইনের মধ্যে দুইজন বাইকার অসুস্থ হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তারা সুস্থ হয়।
একজন গণমাধ্যমকর্মী অভিযোগ করে বলেন, আমি ভোরে তেল নিতে আসি। বিগত দিনেও গেছি, তেলও পেয়েছি। আমার কাছে আমি যে প্রিন্ট মিডিয়ায় তার আইডি কার্ড সঙ্গে ছিল। কিন্তু গাড়ির কাগজ না থাকায় গণমাধ্যমকর্মীদের লাইন থেকে সরে যেতে বলেন ইউএনও। আমি তাৎক্ষণিক সরে এসে দূর থেকে দেখি, অনেককে গাড়ির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ছাড়াই ওনার উপস্থিতিতে তেল দেওয়া হচ্ছে। আমি নিরবে সেখান থেকে চলে আসি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসারের প্রতিনিধি ল্যাপটপে গাড়ির নম্বর এন্ট্রি করছেন। নাম্বারবিহীন “এলিন মোটরস”-এর একটি মোটরসাইকেল তেল পেলে তাৎক্ষণিক আমি জিজ্ঞেস করি, এটাতে কী এন্ট্রি করলেন। তিনি বলেন, চেসিস নম্বর। নাম্বারবিহীন গাড়ি তো তেল পাওয়ার কথা না। তিনি বলেন, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে এসেছে, কী করবো। এসময় গাড়ির নম্বরের জন্য টাকা জমা দেওয়া হয়েছে, নম্বর নেই—টাকা জমার কাগজ অনেক পুরোনো হয়ে গেছে, এমন গাড়িতেও তেল দিতে দেখা গেছে।
উপজেলার একমাত্র হিলি ফিলিং স্টেশনে তদারকি অফিসার উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার অশোক বিক্রম চাকমা মহোদয়ের নির্দেশে গাড়িপ্রতি ৩০০ টাকার তেল পেট্রোল দিচ্ছি। এবারের বরাদ্দ ২৫০০ লিটার পেট্রোল। আজকে কতজন বাইকারকে পেট্রোল দেওয়া হয়েছে এবং নাম্বারবিহীন গাড়ি কীভাবে আপনার উপস্থিতিতে পেট্রোল পেল—জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে সাড়া না পেয়ে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে দিয়েছি। তিনি দেখেছেন, কিন্তু কোনো উত্তর দেননি।
হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার অশোক বিক্রম চাকমা ইতিপূর্বে বলেন, পাম্পে তেল কোনো প্রকার যেন ঝামেলা না হয়, সেই জন্য তদারকি অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন এবং আমি নিজেও উপস্থিত থেকে বাইকের বৈধ কাগজপত্র যাচাই করে প্রতিটি বাইকে পেট্রোল বা অকটেন দেওয়া হয়েছে। আজকে পেট্রোল তেল ৩০০ টাকার দেওয়া হয়েছে। নাম্বারবিহীন কোনো গাড়ি তেল পেয়েছে—এমন নয়। নাম্বারবিহীন গাড়ি তীব্র রোদে তেলের আশায় দাঁড়িয়ে থাকায় সেখানে গিয়ে গাড়ির কাগজপত্র না থাকায় চাবি নিয়ে এসেছি। যদিও অনেক পরে চাবিগুলো ফেরত দিয়েছি। যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই, তাদের ফেরত দেওয়া হয়েছে। কেউ ঝামেলা করতে যেন না পারে, সে কারণে সার্বক্ষণিক নজরদারি রেখেছি। এসব সঠিক তথ্য জানার জন্য ওনার মুঠোফোনে যোগাযোগ করে সাড়া না পেয়ে ওনার হোয়াটসঅ্যাপে দিয়েছি। সেখানে কোনো জবাব না পাওয়ায় তাঁর বক্তব্য লেখা সম্ভব হয়নি।

