জাকিয়া সুলতানা – ধর্মপাশা ( সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগর হাওর – বাওর বেষ্টি উপজেলা দুটি এক সময় মিঠাপানির মৎস্য ভান্ডার হিসাবে খ্যাত ছিল। তারি অংশ বিশেষ ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার টাংঙ্গুয়ার হাওরের অংশ সহ ১০৮ টি ছোট বড় হাওর ও বিল এবং কালাপানি, কংশনদ,কাওনাই নদী, সোমেশ্বরীনদী,সুনই নদী,বৈলাইনদী সহ আরো ছোট বড় ৫ টি নদী এই দুইটি উপজেলাকে ঘিরে রেখেছে।
এখান থেকে বছরে হাজার কোটি টাকার মৎস্য আহরণ হত,কিন্তু দুঃখের সঙ্গে এলাকাবাসী জানায়,ইজারাদাররা ফাল্গুন চৈত্র মাসে অবৈধভাবে খাল বিল শেলুমেশিন দিয়ে শুকিয়ে, বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার কারণে,এবং মশারী জাল,চায়না দুয়ারী জাল,কারেন্টজাল ও চায়না বাইড় দ্বারা হাওর এবং নদীর গুলির মাছের বংশ ধ্বংস করে চলছে । অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাবশালী মহল প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ১ সনের জন্য খাস কালেকশনের নামে বন্দোবস্ত নিয়ে সম্পূর্ণ রুপে বিল বাদল শুকিয়ে মাছ ধরে ফেলে। এতে করে এ অঞ্চলে দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে।
জৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় মাসে হাওরে নদীতে বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা ছাড়ে।
কিন্তু বর্তমানে হাওর ও নদীগুলোতে মাছের প্রজনন খুব তুলনামূলক কম হয়েছে বলে মৎস্য জীবীরা জানিয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলার সবকটি হাওর, বিল,খাল ও নদীতে ১লা মে থেকে ২৮ শে জুন পর্যন্ত সকল প্রকার মাছ ধরা সরকারি ভাবে বিধি নিষেধ থাকার পরও এরিমধ্য কিছু অসাধু মৎস্য শিকারীরা মশারীজাল,খনাজাল,চায়না দুয়ারি জাল ও বেড় জাল দিয়ে দল বেধে ১০/১৫ জন মিলে ৫০০-১০০০ হাত লম্বা জাল দিয়ে হাওরের ইজারাদারদেরকে টাকা দিয়ে দেশীয় মাছের পোনা ও মৎস্য সম্পদ ধ্বংস করে চলেছে।
অন্যদিকে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে ধর্মপাশা এবং মধ্যনগর উপজেলায় বেশ কয়েকটি বর্ষাকালীন মাছের আরদ অস্থায়ী ভাবে তৈরী হয়েছে, যার মধ্যে ধর্মপাশা উপজেলার কান্দাপাড়া বাজারে, মহদীপুর তিন রাস্তার মোড়ে, গোলকপুর বাজারে, শানবাড়ী বাজারে,গাছতলা মাছের আরদ এবং মধ্যনগর উপজেলার ধর্মপাশা – মধ্যনগর সড়কের পাশে সারারকোনা গ্রামের সামনে, গলইখালি রাস্তার পাশে, রুপনগর ঘাটে, নতুন বাজার ও বংশীকুন্ডা বাজারে অসাধু মৎস্য শিকারীরা রাতের আধারে মাছ শিকার করে উল্লেখিত আরদ গুলিতে জাল সহ মাছ ভর্তি নৌকা নিয়ে রাত ১০/১১ টার মধ্যে আরদের পাশে আসে এবং আরদগুলিতে মাছ ক্রয় -বিক্রয় হয় রাত ২টা পর্যন্ত।
আরদ ধার গণ মাছ কিনে বরফ জাত করে বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে বিভিন্ন রোডে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাছ রপ্তানি করে থাকে। দেখার কেউ নেই।
ইতিমধ্যেই ধর্মপাশা উপজেলার সহকারী কমিশনার ( ভূমি) ও মধ্যনগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জয় ঘোষের নেতৃত্বে গত ০২-০৪-২০২৬ তারিখে ধর্মপাশা উপজেলার গোলকপুর বাজারে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনা করে জব্দকৃত নিষিদ্ধ জাল সমূহ জনসম্মুখে তাৎক্ষণিকভাবে পুড়িয়ে দেন এবং গত ১০-০৬-২০২৬ ইং তারিখে ধর্মপাশা উপজেলার কংশ নদের মেউহারি এলাকায় অবৈধ ভাবে মাছ শিকারের অভিযোগে মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ২০২৬ ( সংশোধিত) মোতাবেক এ অভিযান পরিচালনা করেন, ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রট জনি রায়।
এ সময় অবৈধ ভাবে মৎস্য শিকারের দায়ে দুইজন জেলেকে পাঁচ হাজার টাকা করে অর্থদন্ড প্রদান করা হয় এবং জব্দকৃত ৩৭৫ ফুট বেড় জাল আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয়। গত ২৩-০৫-২০২৬ ইং তারিখে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন,মধ্যনগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রট সঞ্জয় ঘোষ, মধ্যনগর উপজেলার টাংগুয়ার হাওরে বিপুল পরিমাণ অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল,কারেন্ট জাল,মশারী জাল ও চায়না বাইড় জব্দ করে তাৎক্ষণিকভাবে আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয়।
এ সময় তিনি বলেন, টাংগুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের এ ধরনের অভিযান নিয়মিত ভাবে পরিচালিত হবে।
বর্তমানে দেশীয় মাছ – ঘোলষা,পাবদা,হিলুন, বাচা, মিনিমাছ,লাটি,কই, শিং, মাগুর, শোল,গজার,পুডা, রিডা,নানিদ,বাগাইড়,লাছ,বোয়াল,ঘাগট,কালিয়া, মাসুল,বাইম,কারগো স্থানীয় বাজার গুলুতে দেখাই যায়না।দেশীয় মাছের মধ্যে টেংরা, পুঁটি,মলা,ঢেলা,তারাবাইম,চিকরাবাইমা, ঘনিয়া মাছের পোনা, কালিয়া মাছের পোনা সচারাচর বাজারে দেখতে পাওয়া যায়, যাহা জনসাধারণের কিনে খাওয়া সাধ্যের বাইরে। পাইকারগণ এই সমস্ত মাছ চরা দামে কিনে ঢাকা সহ বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা শহরে পাঠিয়ে অধিক মুনাফা অর্জন করে।
অন্যদিকে ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার ধর্মপাশা সদর বাজার, মধ্যনগর উপজেলা সদর বাজার, বাদশাগজ্ঞ বাজার, গাছতলা বাজার, জয়শ্রী বাজার, রাজাপুর বাজার, শানবাড়ী বাজার, গোলুকপুর বাজার, বংশিকুন্ডা বাজার, মহেশখলা বাজার সমূহ ঘুরে দেখা যায়, চাষ করা মাছের পশরা সাজিয়ে বসে আছে মাছ বিক্রেতারা- মাছ গুলির মধ্যে রয়েছে, পাংগাশ,তেলাপিয়া, সিলভার, কালিয়া, রুই,মিকরা,কারগো মাছের পোনা, শিং, কই চাষের মাছ বাজার ভরপুর।
এই সকল মাছ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এবং অখাদ্য কুখাদ্য খাইয়ে লালন পালন করা হয় বিধায় উল্লেখিত মাছ সমূহে দুর্গন্ধ করে এবং অনেক রোগের জন্ম দেয় তবু জনসাধারণ বাধ্য হয়ে এই সকল মাছ কিনে খাচ্ছে।
উপরে উল্লেখিত অভিযানের পর থেকে আজ পর্যন্ত ধর্মপাশা মধ্যনগর উপজেলায় অবৈধ জাল দ্বারা মৎস্য শিকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি। মৎস্য শিকারিরা বেপড়ুয়া হয়ে অবৈধ ভাবে মৎস্য শিকারের নামে মৎস্য সম্পদ ধ্বংস করে চলছে।
ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার বিভিন্ন হাওর এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, শত শত অবৈধ জাল দিয়ে মৎস্য শিকারীরা মাছ ও মাছের পোনা শিকার করে চলেছে।
ভুক্তভোগী মহল দাবী জানিয়েছে, অবৈধ মৎস্য শিকারী ও দুনীতি বাজ ইজারাদারদের বিরুদ্ধে আইননানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য উধ্বর্তন কতৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ একান্ত ভাবে কাম্য।ধর্মপাশা উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মৎস্য কর্মকর্তা কে এম মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে মোটো ফোনে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ থাকার কারণে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি।বর্তমানে ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলায় মৎস্য বিভাগের কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে।
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনি রায় বলেন, অবৈধ মৎস্য শিকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করার জন্য ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনা অব্যাহত থাকবে এবং মৎস্য সম্পদ রক্ষার্থে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

