আশুলিয়া প্রতিনিধি শরীফ মিয়া
এসএসসি পরীক্ষার একেবারে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে যখন প্রতিটি মুহূর্ত একজন শিক্ষার্থীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক সেই সময়েই শব্দদূষণের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছিল এক মেধাবী ছাত্রী। পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানে দিন-রাত চলতে থাকা বিকট যন্ত্রের শব্দ হয়ে উঠেছিল তার ভবিষ্যতের জন্য বড় বাধা। তবে হাল ছাড়েনি সে—নিজ উদ্যোগেই যোগাযোগ করে বসে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে। আর সেই সাহসী পদক্ষেপেই বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি।
আশুলিয়ার ইসলাম নগর এলাকার বাসিন্দা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজের এসএসসি পরীক্ষার্থী ইসরাত জাহান আনিশা দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছিলেন না। তার বাসার পাশেই অবস্থিত একটি ফার্নিচার কারখানা থেকে সারাক্ষণ উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টি হচ্ছিল। কাঠ কাটার মেশিন, ড্রিল ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতির বিকট আওয়াজে দিন-রাত অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে পুরো এলাকা, বিশেষ করে আনিশার পড়ার ঘরটি ছিল এর সবচেয়ে কাছাকাছি।
পরিবারের পক্ষ থেকে একাধিকবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বাজার কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রতিবারই আশ্বাস মিললেও বাস্তবে শব্দদূষণ কমানোর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এতে করে আনিশার পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটতে থাকে এবং তার একাডেমিক পারফরম্যান্সেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে।
অবশেষে নিরুপায় হয়ে নিজেই উদ্যোগ নেন আনিশা। বিভিন্ন মাধ্যমে সংগ্রহ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবুর ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর। এরপর সরাসরি ফোন করে নিজের সমস্যার কথা খোলামেলা তুলে ধরেন তিনি। একজন শিক্ষার্থীর এমন সাহসী ও দায়িত্বশীল উদ্যোগে মুগ্ধ হন সংসদ সদস্য।
ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে কোনো দেরি না করে শনিবার সন্ধ্যার পরপরই তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। আনিশার বাসার পাশের ওই ফার্নিচার কারখানায় উপস্থিত হয়ে সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, ইসলাম নগর বাজার কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং আশুলিয়া থানা পুলিশের একটি টিম।
ঘটনাস্থলেই একটি তাৎক্ষণিক বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেখানে কারখানা মালিক, ভুক্তভোগী পরিবার এবং স্থানীয়দের বক্তব্য শোনা হয়। আনিশার মা মোবাশ্বেরা আক্তার আবেগঘন কণ্ঠে জানান, “আমার মেয়ে প্রতিটি ক্লাসে প্রথম হতো। কিন্তু কয়েক মাস ধরে এই শব্দদূষণের কারণে তার পড়াশোনায় ভীষণ সমস্যা হচ্ছে। এখন সে ঠিকমতো পড়তে পারছে না, ফলাফলও খারাপ হচ্ছে।”
সংসদ সদস্য বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত হয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তিনি কারখানা কর্তৃপক্ষকে শব্দদূষণ কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলেন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ইসলাম নগর বাজার কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বিষয়টি তদারকির দায়িত্ব প্রদান করেন।
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। কোনো ধরনের অবহেলা বা উদাসীনতা মেনে নেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তারা সংসদ সদস্যের দ্রুত উপস্থিতি ও কার্যকর পদক্ষেপকে স্বাগত জানান এবং আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যার দ্রুত সমাধান পাওয়া যাবে।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থী আনিশা ও তার পরিবার সংসদ সদস্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তারা আশা করছেন, দ্রুতই শব্দদূষণের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে এবং আনিশা আবারও স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারবে।
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, সচেতন নাগরিকের উদ্যোগ এবং দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধির আন্তরিকতা থাকলে যেকোনো সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব। একইসঙ্গে এটি অন্যদের জন্যও একটি অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে থাকবে।

