আন্তর্জাতিক:
২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষের দিকের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে এক বিরল তুষারঝড়ের কারণে একটি চিপ তৈরির কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে হাজার হাজার মাইল দূরে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম তীরে। চীনের সাংহাইয়ের একজন খাদ্য ডেলিভারি কর্মী জনাব চাং হঠাৎ আবিষ্কার করেন যে, তার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষিত ফোনটির দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। তিনি সম্ভবত কখনো কল্পনাও করেননি যে, কোনো ভিনদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ জটিল বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত তার জীবনকে প্রভাবিত করবে।
এর পেছনে একটি স্পষ্ট কার্যকারণ সূত্র বা চেইন রয়েছে। চরম আবহাওয়া উৎপাদন ব্যাহত করে → মূল উপাদানের ঘাটতি দেখা দেয় → বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত ঘটে → চূড়ান্ত পণ্যের দাম বেড়ে যায় → সাধারণ মানুষ এর বাড়তি খরচ বহন করে। এটি একটি সহজ কিন্তু গভীর বাস্তবতা প্রকাশ করে: আজকের পৃথিবী ইতিমধ্যেই নিবিড়ভাবে সংযুক্ত এবং আমাদের ভাগ্য একে অপরের সঙ্গে জড়িত।
এই ধরনের চ্যালেঞ্জ যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন সমগ্র মানবজাতির সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে: এই আন্তঃসংযুক্ত গ্রহে আমরা কীভাবে আরও স্থিতিস্থাপক, ন্যায়সঙ্গত এবং টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য একসঙ্গে কাজ করতে পারি?
মানবজাতির একটি ‘অভিন্ন কল্যাণের সমাজ’ গড়ে তোলা—এটিই চীনা নেতা সি চিন পিংয়ের দেওয়া উত্তর। এটি কেবল একটি ধারণা নয়, বরং আমাদের সময়ের মূল চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতি একটি গভীর ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া।
কেন আমাদের ‘অভিন্ন কল্যাণের সমাজ’ হয়ে উঠতে হবে? পৃথিবী আজকের মতো সত্যিকারের ‘বিশ্বগ্রাম’ বা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এর মতো আর কখনো ছিল না। প্রযুক্তিগত এবং বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কগুলো দেশগুলোকে একত্রে শক্তভাবে বেঁধে রেখেছে। এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে আমরা সকলেই একসঙ্গে সমৃদ্ধ হই, আবার একসঙ্গে দুর্ভোগও পোহাই।
আমরা সাধারণ স্বার্থ ভাগ করে নিই। একটি মোবাইল ফোনে এক ডজনেরও বেশি দেশের উপাদান থাকতে পারে। একটি দেশের বাজারের ওঠানামা দ্রুত বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলতে পারে।আমরা দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিই। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, সন্ত্রাসবাদ ও সাইবার নিরাপত্তাসহ কোনো দেশই একা এই বহুজাতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারে না।
আমরা সাধারণ মূল্যবোধ ভাগাভাগি করে নিই। মানুষ যেখানেই থাকুক না কেন—সবাই শান্তি, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা করে।
স্বার্থ, দায়িত্ব এবং মূল্যবোধের এই আন্তঃসংযোগ আমাদের স্বীকার করতে বাধ্য করে যে, মানবতা মূলত অভিন্ন ভবিষ্যতের একটি সমাজ। এটি কোনো ‘ইউটোপিয়া’ বা কল্পরাজ্য নয়। এর লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট: স্থায়ী শান্তি, সার্বজনীন নিরাপত্তা, অভিন্ন সমৃদ্ধি, উন্মুক্ততা ও অন্তর্ভুক্তি এবং পরিষ্কার ও সুন্দর পরিবেশের একটি পৃথিবী গড়ে তোলা। এটি মানুষের বেঁচে থাকা এবং উন্নয়নের জন্য একটি অনিবার্য পছন্দ।
শীতল যুদ্ধের মানসিকতা, জিরো-সাম গেম (শূন্য-সমষ্টি খেলা) বা একপক্ষবাদসহ ‘নিজেদের স্বার্থরক্ষা এবং অন্যদের দমন’ করার এই পুরানো পদ্ধতিগুলো আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে কেবল আরও সমস্যা তৈরি করবে। এমনকি তা হিতে বিপরীতও হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং যেমন বলেছেন, “আমরা শারীরিকভাবে একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করলেও মানসিকভাবে অতীতে আটকে থাকার মতো কাজ করতে পারি না। পৃথিবী বদলে গেছে এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও আপডেট করতে হবে।”
‘মানবজাতির অভিন্ন কল্যাণের সমাজ’ ধারণাটি এই নতুন চিন্তাভাবনারই রূপ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সাধারণ চ্যালেঞ্জের মুখে কারও পক্ষেই আর প্রভাবমুক্ত থাকা সম্ভব নয়। কেবল সহযোগিতার মাধ্যমেই আমরা একটি উপায় খুঁজে বের করতে পারি।
এই ধারণাটি মানবজাতির অংশীদারত্বমূলক বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত। প্রাচ্যের জ্ঞান দীর্ঘদিন ধরে ‘পৃথিবী সবার’ এবং ‘মানবতা ও প্রকৃতির মধ্যে সামঞ্জস্য’—এই দার্শনিক তত্ত্ব লালন করে আসছে। এতে জোর দিয়ে বলা হয়, পৃথিবী সব মানুষের আবাসস্থল। সভ্যতাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, একে অপরের কাছ থেকে শেখা উচিত এবং মানবতা ও প্রকৃতির উচিত সুরেলাভাবে সহাবস্থান করা।
ধারণাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। মানবজাতির জন্য একটি ‘অভিন্ন কল্যাণের সমাজ’ গড়ে তোলা কাজের ওপর নির্ভরশীল। সি চিন পিং অনুশীলনের জন্য একটি স্পষ্ট এবং সম্ভাব্য পথ নির্দেশ করেছেন।
রাজনৈতিক সমতা বজায় রাখা এবং সংলাপ ও পরামর্শ করা উচিত। আকার বা আয়তন নির্বিশেষে সব দেশকে একে অপরের সম্মান করা উচিত। বৈরিতা সৃষ্টি এবং ‘ছোট বৃত্ত’ গঠন এড়ানো উচিত। পাশাপাশি নানা বিষয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন।
যৌথ নিরাপত্তা রক্ষা করা ও সহযোগিতার মাধ্যমে মোকাবিলা করা উচিত। একটি সাধারণ, ব্যাপক, সহযোগিতামূলক এবং টেকসই নিরাপত্তা ধারণা প্রতিষ্ঠা করা দরকার। সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা এবং সন্ত্রাসবাদের মতো হুমকি মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করা উচিত।
অর্থনৈতিকভাবে সবাই একই নৌকার যাত্রী, তাই উন্মুক্ত সহযোগিতা পরিচালনা করা উচিত। বিশ্বায়নকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সবার জন্য কল্যাণকর দিকে এগিয়ে নেওয়া উচিত। একই নৌকায় থাকার মতো আমাদের অবশ্যই হাতে হাত রেখে এগিয়ে যেতে হবে।
সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা প্রয়োজন। সভ্যতাগুলোর মধ্যে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব বা হীনম্মন্যতা নেই। আমরা যোগাযোগের মাধ্যমে বোঝাপড়া বাড়াতে পারি এবং পার্থক্যের মধ্যেও সাদৃশ্য খুঁজে পেতে পারি।
পরিবেশগত সুরক্ষা এবং সবুজ উন্নয়ন নিশ্চিত করা উচিত। পৃথিবী মানবজাতির একমাত্র আবাসস্থল। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আমাদের অবশ্যই সহযোগিতা করতে হবে এবং একটি সবুজ ও টেকসই উন্নয়নের পথ অনুসরণ করতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে, এই পাঁচটি দিক একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত এবং একসঙ্গে মানবজাতির ‘অভিন্ন কল্যাণের সমাজ’ গড়ে তোলার জন্য একটি রূপরেখা তৈরি করে।
চীন কেবল তার ধারণাগুলোই সামনে আনে না, বরং কাজের মাধ্যমে সেগুলোকে প্রচারও করে। অভ্যন্তরীণভাবে চীন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত সভ্যতা নির্মাণকে ব্যাপকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ‘পাঁচ-ক্ষেত্র সমন্বিত পরিকল্পনা’ নামে পরিচিত এই অনুশীলনটি তার আন্তর্জাতিক প্রস্তাবগুলোর জন্য অভিজ্ঞতা এবং আস্থা সঞ্চয় করেছে।
আন্তর্জাতিকভাবে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের (বিআরআই) মাধ্যমে চীন বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সভ্যতা এবং বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। রেলপথ নির্মাণ, মহামারি মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া, সবুজ সহযোগিতা প্রচার করা এবং অসহায় জনগোষ্ঠীকে সমর্থন করার মাধ্যমে চীন এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রচেষ্টা বিশ্বে স্থিতিশীলতা যোগ করেছে এবং অভিন্ন উন্নয়নে চালিকাশক্তি যুগিয়েছে।
সূত্র:রুবি-তৌহিদ-লাবণ্য,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।

