উজ্জ্বল চন্দ্র মন্ডল
জেলা প্রতিনিধি, মাদারীপুর।
কৃষি প্রধান বাংলাদেশে ফসল উৎপাদনের জন্য কৃষি জমির বিকল্প নেই। কিন্তু এই কৃষি কাজ আজ বিপন্ন হবার হুমকিতে রয়েছে মানবসৃষ্ট কৃত্রিম পরিবেশ বিপর্যয়ের কারনে।
মাদারীপুর জেলাজুড়ে “অবৈধ ইটভাটা” চলার দরুন পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে কৃষি জমি ও জনবসতি আজ হুমকির মুখে। বন উজার করে কাঠ পোড়ানো নিষিদ্ধ থাকলেও ভাটাগুলোতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আশেপাশের বন উজার করে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে প্রতিটি ইট ভাটায়। এমনকি কিছু ভাটায় নিজস্ব ভাবে তৈরি করা হয়েছে কাঠ কাটার মিল। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ভাটা নির্মাণ ও পরিচালিত না হওয়ায় অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশ ও জলবায়ুর,হুমকির মুখে পরছে জনস্বাস্থ্য ও কৃষিখাত।
জেলায় পরিচালিত ৫৭ টি ইটভাটার একটিরও নেই বৈধ লাইসেন্স বা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। সরকারি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলা এসব পরিবেশ দূষণকারী ইটভাটায় দরকার প্রশাসনের হস্তক্ষেপ। কিছু ভাটা কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যক্রম বৈধ দাবী করে জানান, তারা নিয়ম মাফিক জেলা প্রশাসনের “এল আর ফান্ড” বা “বিশেষ তহবিল” নামক খাতে সরকারী ফি পরিশোধ করেই এ ব্যবসা পরিচালনা করে। প্রশাসন তাদের ভাটা বৈধ বিধায় কখনো হস্তক্ষেপ করে না।
উল্লেখ্য ”ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী” বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাহাড়, গবেষণাগার, সরাকারী বন ও জনবসতিপূর্ণ এলাকার এক কিলোমিটার এড়িয়ার মধ্যে ভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ। কিন্তু মাদারীপুর জেলার ভাটাগুলো পরিদর্শন করলে এর ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। তদন্তু অধিকাংশ ভাটাই গড়ে উঠেছে তিন ফসলি জমির ওপর। ধোঁয়া নির্গমনের জন্য নির্দিষ্ট উচ্চতার চিমনি ব্যবহারের কথা থাকলেও অনেক ভাটায় তা মানা হচ্ছে না। বিষাক্ত ধোঁয়ায় আশপাশের পরিবেশ দূষণ সহ বিভিন্ন বনজ ও ফল প্রদানকারী বৃক্ষ এবং ফসল উৎপাদনকারী কৃষির ক্ষতি সাধিত হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভাটা মালিক জানান, ছাড়পত্র পাওয়া দীর্ঘমেয়াদী ঝামেলার বিষয়। আর আমরা তো প্রতি বছর জেলা প্রশাসনের “এল আর ফান্ড” এ নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দিয়েই বৈধ ব্যবসা করি। কোন সমস্যা থাকলে তো প্রশাসন বাধা দিত।
উল্লেখ যে, ভাটার জন্য মাটির জোগান দিতে ফসলি জমির উপরের উর্বর অংশ (টপ সয়েল) কেটে নেওয়া হচ্ছে। ফলে উর্বরতা হারিয়ে জমি কৃষি উৎপাদন হারিয়ে ফেলছে। এছাড়া চুলা হতে নির্গত ধোঁয়া ও ছাই আশেপাশের জনগণকে বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগে আক্রান্ত করছে।
ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, “আগে এই জমিতে বছরে তিনবার ফসল পেতাম। এখন ভাটার কারনে আমরা নিঃস্ব। ধোঁয়া ও তাপে ধান উৎপাদন হয় না, গাছে ফল নেই। অভিযোগ করেও কোনো বিচার পাই না।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মতে, দ্রুত এই অবৈধ ভাটাগুলো বন্ধ করা কিংবা পরিবেশ বান্ধব পদক্ষেপ নেয়া উচিত। যদি সেটা না করা হয় তবে অদূর ভবিষ্যতে মাদারীপুর জেলা এক ভয়াবহ পরিবেশ ও জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখে পড়বে যা বেশি সময়ের ব্যবধানে নয়। তারা বলছেন, প্রশাসনের উচিত ভাটা কর্তৃপক্ষের নিকট হতে কোনো ফান্ড গ্রহণ না করে জনস্বার্থে এসব মৃত্যুফাঁদ গুঁড়িয়ে দেওয়া নয়তো বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া অতীব জরুরী।

