রাহমান তৈয়ব
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে রাষ্ট্র যখন এককভাবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি, তখন বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পরবর্তীকালে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন আংশিকভাবে সরকারি তহবিল থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, যা “মাসিক বেতনভুক্তি” বা এমপিও (Monthly Pay Order) নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি সহায়তা পেলেও প্রশাসনিক কাঠামো ও সুবিধার ক্ষেত্রে তারা পুরোপুরি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমতুল্য নয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা নানা বৈষম্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন। এই বাস্তবতায় এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধাপে ধাপে জাতীয়করণের দাবি এখন সময়োপযোগী এবং যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BANBEIS) তথ্য অনুযায়ী দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই বেসরকারি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কয়েক কোটি। অর্থাৎ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল দায়িত্ব কার্যত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই বর্তায়। অথচ একই দায়িত্ব পালন করেও এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা সরকারি শিক্ষকদের মতো পূর্ণ সুযোগ-সুবিধা পান না। তাদের বেতন কাঠামো সীমিত, পদোন্নতির সুযোগ কম, পেনশন সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের অংশগ্রহণ কম। এর ফলে শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
একই রাষ্ট্রের অধীনে একই ধরনের পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করেও সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মধ্যে যে বৈষম্য বিদ্যমান, তা শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক ভারসাম্যের জন্যও অনুকূল নয়। শিক্ষাবিদদের মতে, পেশাগত নিরাপত্তা ও মর্যাদা না থাকলে শিক্ষকরা তাদের সর্বোচ্চ দক্ষতা প্রয়োগ করতে পারেন না। ফলে শিক্ষার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিক্ষকদের মর্যাদা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পেশা এবং শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এখনও সেই কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা ও নিরাপত্তা পুরোপুরি পাননি। ফলে শিক্ষানীতির ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য এ ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার জরুরি হয়ে উঠেছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো শিক্ষাব্যবস্থায় সমতা প্রতিষ্ঠা। একই ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা সত্ত্বেও দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থার কারণে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে, তা শিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশকে দুর্বল করে। জাতীয়করণ হলে শিক্ষকরা একই বেতন কাঠামো, একই পদোন্নতি ব্যবস্থা এবং একই প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় কাজ করতে পারবেন। এতে শিক্ষকদের মধ্যে পেশাগত সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পাবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আসবে।
শুধু শিক্ষক নয়, শিক্ষার্থীরাও এর সুফল ভোগ করবে। জাতীয়করণ হলে সরকার সরাসরি অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে পারবে। ফলে শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যকার বৈষম্য কমে আসবে। বর্তমানে অনেক গ্রামীণ এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে শিক্ষার মান ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। জাতীয়করণ হলে এসব প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সরকারের সরাসরি বিনিয়োগ সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অধিকাংশই মাধ্যমিক শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করে। ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বে অন্যতম সফল হিসেবে বিবেচিত। সেখানে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এবং শিক্ষকরা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পেশাজীবী হিসেবে বিবেচিত। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরেও শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রের শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে, যা তাদের মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশও বর্তমানে একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারের ঘোষিত “স্মার্ট বাংলাদেশ” ধারণা বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই মানবসম্পদ তৈরির মূল ভিত্তি হলো শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক ও UNESCO-এর বিভিন্ন গবেষণায়ও বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি।
তবে বাস্তবতা হলো, একযোগে দেশের সব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা সরকারের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নাও হতে পারে। তাই অনেক শিক্ষাবিদ ধাপে ধাপে জাতীয়করণের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রথম পর্যায়ে অবকাঠামো, শিক্ষার মান, শিক্ষক যোগ্যতা এবং শিক্ষার্থী সংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। পরবর্তীতে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পর্যায়ক্রমে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণের আওতায় আনা যেতে পারে।
এছাড়া জাতীয়করণের পাশাপাশি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। শুধু প্রতিষ্ঠান সরকারি করলেই শিক্ষার মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নত হবে না; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত তদারকি এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশ্নটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ এ প্রতিষ্ঠানগুলোই দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলছে। তাই শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার, শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা এবং জাতীয় উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধাপে ধাপে জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।
শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি জাতির অগ্রগতির মূল ভিত্তি। একটি শক্তিশালী, বৈষম্যহীন ও মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বিষয়টি সেই দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।

