রাজধানী ঢাকা থেকে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় একটি ট্রাভেল ও কনসালটেন্সি চক্রকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিদেশে চাকরি ও ভিসা প্রসেসিংয়ের আশ্বাস দিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে আত্মগোপনে গেছেন বলে দাবি করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে ত্রিধা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস, ত্রিধা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আশীর্বাদ স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি এবং আশীর্বাদ ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস নামের প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত প্রধান ব্যক্তি হিসেবে বিপ্লব ভট্টাচার্য–এর নাম উঠে এসেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রথমদিকে মৌলভীবাজার জেলায় আশীর্বাদ স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি এবং আশীর্বাদ ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর আশ্বাস দেওয়া হতো। ভুক্তভোগীদের দাবি, সার্বিয়া সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজের সুযোগের কথা বলে বহু মানুষের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। অনেকেই জমি বিক্রি, সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ঋণ নিয়ে এই টাকা জোগাড় করেছিলেন।
তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময় পার হলেও বিদেশ যাওয়ার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা করা হয়নি। শুরুতে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হলেও ধীরে ধীরে সংশ্লিষ্টদের যোগাযোগ কমে আসে এবং একপর্যায়ে অফিস কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে অনেকেই জানতে পারেন যে ঢাকায় এসে ত্রিধা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একই ধরনের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
দৈনিক স্বাধীন সময়–এর অনুসন্ধানী টিম রাজধানীর বাড্ডা লিংক রোড, ট্রপিক্যাল মোল্লা টাওয়ার–এ অবস্থিত ত্রিধা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস–এর অফিসে গিয়ে দেখতে পায় অফিসটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। আশপাশের ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক মাস ধরে সেখানে কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, বিদেশে পাঠানোর নামে সংগৃহীত অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—
বিপ্লব
মোবাইল: 01618-842817, +8801837547061
ত্রিধা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস বিপ্লব
পিতা: মৃত বিনয় ভুষণ ভট্টাচার্য
মাতা: দিপাভূষণ ভট্টাচার্য
জন্ম তারিখ: ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২
স্থায়ী ঠিকানা:
দক্ষিণ হীংজাগিয়া, ডাকঘর: হীংজাগিয়া–৩২৩০, কুলাউড়া, মৌলভীবাজার।
রনি
মোবাইল: 01823-932792
মাশুক
মোবাইল: +8801672174905
মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মুতি
মোবাইল: 01799565570, 01799568090
অভিযোগ রয়েছে, আশীর্বাদ স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি ও আশীর্বাদ ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস–এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মতি অর্থ সংগ্রহ ও বিভিন্ন ডকুমেন্ট প্রসেসিংয়ের কাজে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
তার পরিচয় সম্পর্কে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে—
মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মুতি
পিতা: কালা মিয়া
গ্রাম: ছোট বহুলা
পোস্ট: রিচি–৩৩০০
উপজেলা: হবিগঞ্জ সদর, হবিগঞ্জ
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, মৌলভীবাজারে কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মতি ঢাকায় এসে ত্রিধা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস–এর সঙ্গেও যুক্ত হয়ে কাজ করতেন বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। তবে বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু সূত্র দাবি করছে, তাকে নরসিংদী এলাকায় অবস্থান করতে দেখা গেছে, যদিও তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
অন্যদিকে ভুক্তভোগীরা আরও অভিযোগ করেছেন, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কিছু কর্মচারী কয়েক মাস কাজ করার পরও তাদের বেতন পাননি। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দেন। একই সঙ্গে অফিস ভাড়া, আসবাবপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জামের বকেয়া নিয়েও বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, বিপ্লব –এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত রনি, মাশুক এবং মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মুতি এখনো পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
ভুক্তভোগীদের আরও দাবি, ত্রিধা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস–এর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ বর্তমানে বন্ধ থাকলেও কিছু পুরনো গ্রাহকের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং তাদের কাছে আবারও পুরনো অফিসের ঠিকানা— বাড্ডা লিংক রোড, ট্রপিক্যাল মোল্লা টাওয়ার—দেওয়া হচ্ছে।
কয়েকজন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তাদের ধারণা—কিছু ক্ষেত্রে অফিসের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার মাধ্যমে নতুনভাবে লেনদেনের চেষ্টা করা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীদের অনেকেই জানিয়েছেন, তারা বর্তমানে মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কেউ ঋণের বোঝা নিয়ে দিশেহারা, কেউ আবার পরিবারের সঞ্চিত অর্থ হারিয়ে সামাজিক ও মানসিক চাপে আছেন। এমনকি অভিযোগ রয়েছে, বিপ্লব ভট্টাচার্য নিজের আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকেও বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়েছিলেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা হতে পারে।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজন ইতোমধ্যে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। তাদের কাছে লেনদেনের রসিদ, ব্যাংক ডকুমেন্ট, চেক ও বিভিন্ন যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে বলেও জানা গেছে।
দৈনিক স্বাধীন সময়–এর কাছে এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য ও নথি সংরক্ষিত রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তা পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে।

