উজিরপুর উপজেলা প্রতিনিধি
সবুজ হাওলাদার
বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় প্রায় আড়াই লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ভরসা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সুলভ ও সহজে চিকিৎসাসেবা পেতে আসা রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ পেলেও বিপাকে পড়েন রোগ নির্ণয়ের জন্য নানা পরীক্ষা করাতে গিয়ে। এ উপজেলায় একটি পৌরসভার ও নয়টি ইউনিয়নের গ্রামের রোগীদের প্যাথলজি পরীক্ষার জন্য বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাতে সক্রিয় রয়েছে একটি দালাল চক্র। তাদের কর্মকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ সব দালালচক্র খোদ চিকিৎসকদের ছত্রছায়ায় সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সোমবার (২০ এপ্রিল) সকালে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, রোগী ধরতে ব্যস্ত ১০ থেকে ১৫ জন দালাল। কমিশনের বিনিময়ে সরকারি হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা পাঁচ থেকে ছয়টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী ভাগিয়ে নিতে কাজ করছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগ ও ইমার্জেন্সি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, হাসপাতালের দু’জন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সাথে আঁতাত করে রোগীর ব্যবস্থাপত্রে কিংবা সাদা টোকেনে প্যাথলজি পরীক্ষার নাম লিখে দেন। চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বের হওয়া মাত্রই রোগীর হাত থেকে ব্যবস্থাপত্র কেড়ে নেয় দালালরা। রোগীদের তারা নিজেদের পছন্দের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পাঠিয়ে দেন।
সেবা নিতে আসা রোগীদের সাথে কথা বলে পাওয়া গেছে আরো অনেক অভিযোগ। ভুক্তভোগী রোগীরা জানান, ক্লিনিক ও ডায়াগস্টিক সেন্টার চালাচ্ছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তাররাই। ক্লিনিকগুলোতে রোগীদের পাঠিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করানো হচ্ছে কারণে-অকারণে। দিন শেষে পকেট ফাঁকা হলেও রোগের সঠিক তথ্য নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন না তারা।
উপজেলার বামরাইল ইউনিয়ন থেকে এক স্বজনকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসা আয়শা খাতুন বলেন, ‘ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর দালালরা সবসময় হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করে। অনেক দালাল ডাক্তারের রুমেই বসে থাকে। চিকিৎসকরা প্রেসক্রিপশন দেয়া মাত্রই তারা রীতিমত হামলে পড়ে রোগীর ওপর। কাগজ নিয়ে তাদের নিজ নিজ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান পরীক্ষার জন্য। হাতিয়ে নেন মোটা অঙ্কের টাকা।’
উপজেলার ওটার ইউনিয়ন থেকে চর্মরোগে আক্রান্ত শিশু মিথিলাকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন তার মা ইসরাত জাহান। তিনি বলেন, ‘মেয়ের মুখে দানা দানা কি যেন হয়েছে। হাসপাতালে এলে ডাক্তার ওষুধ লিখে দিয়েছে এবং ব্যবস্থাপত্রে একটা মোবাইল নম্বর লিখে দিয়েছেন। বলেছেন এ নম্বরে পরে কল দেয়ার জন্য।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর ব্যবস্থাপত্রের বিপরীত পৃষ্ঠায় লিখে দেয়া হয় চিকিৎসকের সংক্ষেত।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে জোসনা, মুহাম্মদ আলী, মাইশাসহ কয়েকজন রোগী জানান, হাসপাতালে এলেই নানা পরীক্ষা ধরিয়ে দেয়া হয়। পরে দালালরা রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করে পরীক্ষা করায় তাদের নির্দিষ্ট করা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সাধারণ মানুষ হাসপাতালে আসে সহজ ও সুলভমূল্যে চিকিৎসা নিতে। কিন্তু যদি কারণে-অকারণে পরীক্ষা-নিরীক্ষার লম্বা কাগজ তুলে দেয়া হয় তা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সব ধরনের পরীক্ষা হাসপাতালে করা হলে উপকার হতো বলেও জানান তারা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: এস এম মাইদুল ইসলামের সাথে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: আলী সুজা বলেন, ‘হাসপাতালে রোগীদের নিয়ে বেচাকেনা ও দালালি টোটালি বন্ধ করা হবে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে কঠোর পদক্ষেপ নিতে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। উপজেলার একটি মানুষও যেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে হয়রানির শিকার না হয়, তা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।’

