এমরান হোসেন, জামালপুর প্রতিনিধি।।
জামালপুরের ৭টি উপজেলায় চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে। প্রতিবছরই কৃষকরা ভুট্টা চাষে নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার চরাঞ্চলে চাষাবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কৃষকদের অধিক লাভবান করছে।অনুকূল আবহাওয়া, মাটি উপযোগী ও কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় এবং কৃষি বিভাগের প্রণোদনায় দিন দিন এ জেলায় ভুট্টা চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জেলার ৭টি উপজেলার মধ্যে মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জে সবচেয়ে বেশি ভুট্টা আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে চলতি মৌসুমে ভুট্টার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। যা এই অঞ্চলের কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মাদারগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় তিন হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও পাঁচ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে । গত ১০ বছরে এ উপজেলায় ভুট্টার আবাদ বেড়েছে প্রায় ৬৪ গুণ।২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী এ উপজেলায় ভুট্টার চাষ হয়েছিল মাত্র ৮০ হেক্টর জমিতে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মাদারগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর, চর ভাংবাড়ী, গড়পাড়া, চরপাকেরদহ, তেঘরিয়া, চর হিদাগাড়ী, মির্জাপুর, নব্বইচর, আটাত্তর চর, চর শুভগাছা, সুখনগরী, ফুলজোড়, পশ্চিম জটিয়ারপাড়া, ছালাবান্দা, বাগলেরগড়, হাটমাগুড়া, জোনাইল নামাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ভুট্টা চাষ হয়েছে । মাঠের পর মাঠ শুধু সবুজ রংয়ের ভুট্টা গাছ দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। গাছে গাছে আসতে শুরু করেছে ভুট্টার মোচা। বাম্পার ফলনের আশায় ভুট্টার জমিতে পানিসেচ, নিড়ানি এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগে কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। এসব কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো।
নব্বইচর এলাকার কৃষক রহিম মিয়া বলেন, চরে ১২ বিঘা জমিতে ভুট্টার চাষ করছি। আগাম জাতের হওয়ায় গাছে গাছে কলা (মোচা) আসতে শুরু করেছে । গেল(গত) বছর ভুট্টার দ্বিগুণ ফলন পাইছি। এবারও ভাল ফলন পাবো আশা করছি।
কড়ইচুড়া ইউনিয়নের ছালাবান্দা এলাকার কৃষক কাইয়ুম বলেন, ধান আবাদের চেয়ে কম খরচ করে দ্বিগুণ ভুট্টা উৎপাদন করা যায়। বিগত বছরগুলোতে ভুট্টা চাষ করে আমার পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে। এবারও ভুট্টার আবাদ করেছি। আশা করছি ভালো ফলন হবে।
মাদারগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো: হাবিবুর রহমান বলেন, উপজেলায় চলতি মৌসুমে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে ভুট্টা আবাদ হয়েছে। সব ধরনের ফসল উৎপাদনে আমরা চাষিদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করছি। পাশাপাশি বিভিন্ন পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করছি। ভুট্টা চাষে খরচ অনেক কম কিন্তু দাম অনেক ভালো। একি সাথে ভুট্টার গাছ গো-খাদ্য ও জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা যায়। বর্তমানে বাজারে ভুট্টার চাহিদাও অনেক বেশি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার ভুট্টার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
মেলান্দহ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রউফ জানান, ভুট্টা চাষিরা অনেক বেশি লাভবান হওয়ার কারণে এর আবাদ অনেক বেড়ে গেছে। ভুট্টার দানাকে আমরা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে পারি, মুরগির খাবারেও ব্যবহার হয়ে থাকে। চরাঞ্চল গুলোতে প্রাণির খাবারের অভাব থাকার কারণে কৃষকরা ঘাস হিসেবেও ভুট্টা বিক্রি করে থাকে। ভুট্টার অতিরিক্ত অংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যাপক চাহিদা আছে। এই কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, কৃষি বিভাগ ভুট্টা চাষিদের বীজ ও সার প্রণোদনা দিয়ে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন রোগ বালাই হলে পরামর্শ ও সহযোগিতা করে থাকে।
ইসলামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, ভুট্টা চাষ একটি স্বল্প সময়ের লাভজনক ফসল।পতিত জমিতে স্বল্প সময় এবং স্বল্প খরচে লাভজনক হওয়ায় দিন দিন ভুট্টা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে কৃষকরা। তাই প্রতিবছর এ অঞ্চলে ভুট্টা চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।এ বছর ইসলামপুর উপজেলায় দুই হাজার ২৬৬ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ক্ষেত অনেক ভালো হয়েছে।
সরিষাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অনুপ সিংহ জানান, এ বছর উপজেলায় গত বছরের তুলনায় বেশি জমিতে ভুট্টা আবাদ হয়েছে।বিশেষ করে যমুনা তীরবর্তী এলাকায় ভুট্টা আবাদ ভালো হচ্ছে। আমারা এই এলাকার কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে উন্নত মানের বীজ, সার কীটনাশক, আর্থিক সহযোগিতা করেছি। আশা করছি এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভুট্টার বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগ জানায়, ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী জেলায় প্রায় ২২ হাজার ৬৪৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২ হাজার ৩৭৭ হেক্টর বেশি। কৃষকরা ভালো ফলন ও দামের কারণে আগ্রহ দেখাচ্ছে।বর্তমানে বিভিন্ন জাতের ভূট্টা ১২ মাসই চাষ হচ্ছে । আবহাওয়া অনুকলে থাকলে প্রতি একর জমিতে ১২০ থেকে ১৩০ মণ ভুট্টার ফলন পাওয়া যায়। এ বছর প্রতি মণ ভুট্টা ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে ১০-১২ হাজার টাকা খরচ করে ৪০ হাজার টাকার অধিক আয় হচ্ছে।
প্রাণিবিদদের তথ্য মতে, গো-খাদ্য হিসেবে তৈরিকৃত ভুট্টার সাইলেজে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ও মিনারেল এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। এই খাদ্য গ্রহণের ফলে দুগ্ধদানকারী গাভীর দুধ বেড়ে যায় অনেক গুণে। কম সময় ও স্বল্প অর্থ ব্যয় হওয়ার ফলে কৃষকদের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জামালপুর কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান বলেন, “কম খরচে ভুট্টার ফলন অনেক বেশি হয়ে থাকে। তাই ভুট্টা চাষে ঝুঁকছেন মানুষ। এবছর আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে ভুট্টা আবাদ হয়েছে। এবার কোনো ধরনের পোকার আক্রমণ ও রোগবালাই নেই। মাত্র ১২০ থেকে ১৩০ দিন পর এটি হারবেস্ট করা যায়। এখন পর্যন্ত কৃষকদের তেমন ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি। আশা করা যাচ্ছে, এবার ভুট্টার বাম্পার ফলন হবে।”

