আন্তর্জাতিক:
সৌরশক্তি একটি পরিচিত ধারণা, কিন্তু চীনের ফটোভোল্টাইক (পিভি) প্রযুক্তি অনেক উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ পরিবারগুলোকে নীরবে বদলে দিচ্ছে। কোনো জটিল পরিস্থিতি বা দীর্ঘ দূরত্ব ছাড়াই, সৌর প্যানেল সূর্যালোককে ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে, স্থানীয় জীবনকে আলোকিত করে এবং আরও পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করে।
দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ ঘাটতিতে জর্জরিত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশে একসময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। শিশুরা রাতে শান্তিতে পড়াশোনা করতে পারত না, কারখানাগুলো স্থিতিশীলভাবে চলতে পারত না এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো। স্থানীয় বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে চীনা পিভি প্রযুক্তির আগমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী ময়মনসিংহ পিভি বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার চীনা সৌর প্যানেল সুবিন্যস্তভাবে স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পিভি প্রকল্প হিসেবে এটি প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উত্পাদন করে এবং ৫০ হাজার টনেরও বেশি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করে, যা বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ কমানোর পাশাপাশি পরিবেশকেও রক্ষা করে।
চীনা কোম্পানিগুলোর দ্বারা নির্মিত ৬৮ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সিরাজগঞ্জ ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশে নতুন শক্তির জন্য একটি আদর্শ প্রকল্প। ১৫ লাখ ৭ হাজার উচ্চ-দক্ষতাসম্পন্ন ফটোভোলটাইক মডিউল দ্বারা সজ্জিত এই কেন্দ্রটি বছরে প্রায় ৬৫ হাজার পরিবারকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন প্রায় ১১ লাখ টন কমিয়ে আনে। বাংলাদেশের উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্র পরিবেশ বিবেচনা করে, চীনা দলটি বিশেষভাবে দ্বি-পার্শ্বীয় বিদ্যুৎ উত্পাদন প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে, যা সূর্যালোকের পূর্ণ ব্যবহার ও বিদ্যুৎ উত্পাদন দক্ষতা উন্নত করে। এটি সমগ্র দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জন্য একটি অনুকরণযোগ্য ‘চীনা সমাধান’ প্রদান করে। বড় আকারের ভূমি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে শুরু করে, ছোট আকারের আবাসিক ব্যবস্থা, শহুরে কারখানা থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত চীনা ফটোভোলটাইক তার সমগ্র সরবরাহ-শৃঙ্খলজুড়ে থাকা সুবিধার মাধ্যমে, বাংলাদেশের বিভিন্ন চাহিদার সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তি অর্জনের দেশের লক্ষ্যকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করছে।
সবুজ শক্তির এই ঢেউ প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানেও পৌঁছেছে। পাকিস্তান বিদ্যুৎ ঘাটতি ও বিদ্যুতের উচ্চ মূল্যের সম্মুখীন, কিন্তু চীনা পিভি ব্যবস্থা উচ্চ ব্যয়-সাশ্রয়ীতা, উচ্চ-তাপমাত্রা সহনশীলতা ও সহজ স্থাপনের সুবিধার কারণে দ্রুত স্থানীয় পরিবারগুলোর পছন্দের বিকল্প হয়ে উঠেছে। পরিসংখ্যানে বলা হয়, পাকিস্তানে আমদানি করা সোলার প্যানেলের ৯৫ শতাংশেরও বেশি চীনা পণ্য ও গত তিন বছরে আমদানি প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। সাধারণ পরিবারগুলোর জন্য, একটিমাত্র পিভি ব্যবস্থা দিনরাত স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে, যা এয়ার কন্ডিশনার ও রেফ্রিজারেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির নির্ভরযোগ্য ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি, বিদ্যুতের বিলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
বর্তমান পাকিস্তানে সৌর ফটোভোল্টাইক সিস্টেমগুলো, এমনকি একটি জনপ্রিয় ‘প্রকৃত যৌতুক’ হয়ে উঠেছে, যা সোনা ও গহনার চেয়েও বেশি আকাঙ্ক্ষিত। এই ‘সূর্যের যৌতুক’ পরিবারগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা ও সুখ নিয়ে আসে; যেখানে অনেক নারী স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহসহ ছোট ছোট কর্মশালা শুরু করে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করছেন। সবুজ ও স্বল্প-কার্বন জীবনযাপনের ধারণা ধীরে ধীরে একটি নতুন ধারায় পরিণত হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, শুধু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশেই চীনের ফটোভোলটাইক শক্তি ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এর কারণ খুবই সহজ: এটি বাস্তবসম্মত, কার্যকর এবং প্রকৃত সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। চীনের একটি সম্পূর্ণ ও পরিপক্ক ফটোভোলটাইক শিল্প-শৃঙ্খল রয়েছে, যার পণ্যগুলো অত্যন্ত দক্ষ, টেকসই ও বিভিন্ন জটিল পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন কোনো রাজনৈতিক শর্ত আরোপ না করা বা প্রযুক্তিগত একচেটিয়া আধিপত্যে না যাওয়ার নীতি মেনে চলে। এর মাধ্যমে অংশীদার দেশগুলো যাতে সমান ও বাস্তবসম্মত সহযোগিতার মাধ্যমে সত্যিকারের অর্থে পরিচ্ছন্ন শক্তি পেতে ও তা বহন করতে পারে।
একটি ছোট সৌর প্যানেল আন্তঃদেশীয় সহযোগিতার সেতু নির্মাণ করেছে। এটি কোনো ফাঁকা বুলি নয়, বরং বাস্তব পরিবর্তন নিয়ে আসে: বাড়িগুলোতে আর বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয় না, শিশুরা উজ্জ্বল আলোর নিচে শান্তিতে পড়াশোনা করতে পারে, কারখানাগুলো স্থিতিশীলভাবে চলতে পারে এবং পরিবেশ আরও পরিচ্ছন্ন হয়। এটাই সবচেয়ে সহজ সত্য: ভালো প্রযুক্তির কাজ হলো সাধারণ মানুষের সেবা করা এবং ভালো সহযোগিতার মাধ্যমে প্রকৃত সুখ বয়ে আনা।
সূর্যালোক বিশ্বের সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত সম্পদ। চীন সূর্যালোক ব্যবহারের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা আরও অভাবগ্রস্ত দেশগুলোর সাথে ভাগ করে নিতে ইচ্ছুক। ভবিষ্যতে চীন সূর্যালোককে সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শক্তির উত্স হিসেবে গড়ে তুলতে অন্যান্য দেশের সাথে কাজ করে যাবে, যাতে সবুজ উন্নয়ন আরও বেশি সাধারণ মানুষের উপকারে আসে। বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে ও একসাথে একটি পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পৃথিবী গড়তে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ও করে যাবে চীন।
সূত্র:ছাই-আলিম-ওয়াং হাইমান,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।

