রিয়াজুল ইসলাম, হাতিয়া প্রতিনিধি:
মেঘনার বুকে দাঁড়িয়ে আছে একটি ব্রিজ। চারপাশে থইথই পানি, কোনো সড়কের সংযোগ নেই। দূর থেকে মনে হয়—অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত একটি অদ্ভুত সেতু। কিন্তু না, এটি এক সময় ছিল হাজারো মানুষের প্রাণের সেতু।
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চানন্দী ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে অবস্থিত এই লাল পোল ব্রিজটি এক সময় কালাদূর থেকে ভূমিহীন বাজারে যাতায়াতের একমাত্র পথ ছিল। প্রতিদিন হাজারো মানুষ পাড়ি দিতো এই ব্রিজের উপর দিয়ে। কৃষকরা ফসল নিয়ে যেত বাজারে, শিক্ষার্থীরা যেত স্কুলে, ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহন করতেন সহজে।
কিন্তু আজ সবই অতীত। মেঘনার ভয়াল ভাঙন একে একে গিলে ফেলেছে পুরো সড়কপথ, বসতভিটা ও ফসলের জমি। ভেঙে গেছে স্থানীয়দের অর্থনীতি, হারিয়ে গেছে বহু পরিবার। সেতুটি আজ একা দাঁড়িয়ে আছে, যেন নদীর বুকে স্মৃতির সাক্ষী হয়ে।
চানন্দী ইউনিয়নের এক বৃদ্ধ কৃষক বলেন, আমরা অসংখ্যবার এই ব্রিজ পার হয়ে কালাদূর বাজারে গেছি। মোটরসাইকেলে কত পথ পাড়ি দিয়েছি তার হিসেব নেই। আজ নদী সব গিলে খেয়েছে। কিন্তু সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে আমাদের করুণ স্মৃতির সাক্ষী হয়ে।”
অন্য এক স্থানীয় বাসিন্দা চোখের পানি লুকিয়ে বলেন, ভাঙনে আমরা নিঃস্ব। ঘরবাড়ি নেই, জমি নেই, জীবিকার পথও নেই। ব্রিজটি দেখলে বুকের ভেতর হাহাকার বেড়ে যায়। মনে হয়, আমাদের অতীতকে নদীর বুক থেকে কেউ মুছে ফেলতে পারছে না।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী ফাহিমের কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট, নদীভাঙনে শুধু ঘরবাড়ি নয়, আমাদের রুটি-রুজিও ভেসে গেছে। মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করেছি; কিন্তু সাড়া মেলেনি। যদি দ্রুত টেকসই বাঁধ না দেওয়া হয়, তাহলে পুরো ইউনিয়নই নদীতে মিলিয়ে যাবে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নোয়াখালী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হালিম সালেহী জানান, প্রায় এক বছর আগে ব্রিজটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আশপাশে বসতভিটা, সড়ক—কিছুই নেই। ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ প্রতিরক্ষা প্রকল্প একনেকে পাস হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে নদীভাঙন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করছি। তবে ব্রিজটি নিয়ে তেমন কিছু করার আর সুযোগ নেই।”
আজও নদীর বুকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে লাল পোল ব্রিজটি। একদিকে এটি ভাঙন কবলিত মানুষের হাহাকারের প্রতীক, অন্যদিকে হারানো দিনের স্মৃতিচিহ্ন। যদি দ্রুত নদী রক্ষার ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে হয়তো এই সেতুটিও একদিন নদীর তলদেশে মিলিয়ে যাবে।

